ওঘুজ তুর্ক ইতিহাসের গ্রহণযোগ্য মহাকাব্য “দেদে কোরকুত” কি জেনে নিন

দেদে কোরকুত বই বা কোরকুত আতার বই ওঘুজ তুর্কিদের মহাকাব্যের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত। গল্পগুলি যাযাবর তুর্কি জনগণের সামাজিক জীবনধারা এবং তাদের প্রাক-ইসলামিক বিশ্বাসের জন্য নৈতিকতা ও মূল্যবোধ বহন করে।

বইটির পৌরাণিক আখ্যানটি মূলত তুরস্ক, আজারবাইজান এবং তুর্কমেনিস্তানের ওঘুজ তুর্কি বংশোদ্ভূত মানুষের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ।

ফারসি ভাষায় দেদে কোরকুত

এই বইটির শুধুমাত্র দুটি পাণ্ডুলিপি, ভ্যাটিকান এবং ড্রেসডেন, ২০১৮ সাল পর্যন্ত পরিচিত ছিল। গনবাদ(ইরানী ফারসি ভাষা) পাণ্ডুলিপি আবিষ্কারের পর এই বইটিতে একটি নতুন পর্ব যোগ করা হয়েছে। ফারসি পাণ্ডুলিপির ভাষা একটি মিশ্র অক্ষরের এবং এটি ইরানী আজারবাইজানের প্রাচীন ওঘুজ তুর্কিক থেকে প্রারম্ভিক আধুনিক তুর্কিতে উত্তরণের সময়কালের উজ্জ্বল বৈশিষ্ট্যগুলিকে চিত্রিত করে।

যাইহোক, পূর্ব তুর্কিতে অদ্ভুত বিশুদ্ধ বানান, আভিধানিক এবং ব্যাকরণগত কাঠামো রয়েছে, যা প্রমাণ করে যে এই বইটি সিরদারিয়া এবং আনাতোলিয়ার মধ্যবর্তী অঞ্চলে লেখা হয়েছিল এবং পরে ১৬ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে সাফাভিদ ইরানে পুনরায় লেখা হয়েছিল।

এটি পরে ইরানের কাজারে  ১৮ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে আবার কপি করা হয়। তবে ফারসি পাণ্ডুলিপির প্রথম পাতা পাওয়া যায়নি। এই কারণে, পাণ্ডুলিপির নাম কীভাবে লিখিতভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল তা জানা যায়নি।

মঙ্গোলিয়ান এবং তুর্কি ভাষা পরিবারগুলির মধ্যে মোট ১,০০০ টিরও বেশি রেকর্ডকৃত মহাকাব্যের মধ্যে দেদে কোরকুতের মহাকাব্যটি সবচেয়ে পরিচিত ও প্রসিদ্ধ।

মহাকাব্যের উত্স এবং সংক্ষিপ্তসার

দেদে কোরকুত হল একটি বীরত্বপূর্ণ দাস্তান (কিংবদন্তি), যা ওঘুজ তুর্কি জনগণের মধ্যে ওঘুজ-নামেহ নামেও পরিচিত, যা মধ্য এশিয়া থেকে শুরু হয়, আনাতোলিয়ায় চলতে থাকে এবং এর বেশিরভাগ ইতিহাস আজারবাইজানি ককেশাসে কেন্দ্র করে।বার্থহোল্ডের মতে, “এটা অনুমান করা সম্ভব নয় যে এই দাস্তান(কিংবদন্তি) বইটি ককেশাস ছাড়া অন্য কোথাও লেখা হতে পারে”।

তুর্কি জনগণের জন্য, বিশেষ করে যারা নিজেদেরকে ওঘুজ বলে পরিচয় দেয়, এটি সমগ্র ইতিহাস জুড়ে তুর্কি জনগণের জাতিগত পরিচয়, ইতিহাস, রীতিনীতি এবং মূল্যবোধের প্রধান ভান্ডার।

এটি এমন একটি সময়ে স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামের স্মৃতিচারণ করে যখন ওঘুজ তুর্কিরা পশুপালনকারী মানুষ ছিল, যদিও “এটা স্পষ্ট যে গল্পগুলি তাদের বর্তমান আকারে এমন একটি সময়ে স্থাপন করা হয়েছিল যখন ওঘুজ বংশোদ্ভূত তুর্কিরা নিজেদেরকে ওঘুজ বলে মনে করত না।” দশম শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে, ‘ওঘুজ’ শব্দটি ধীরে ধীরে তুর্কিদের মধ্যে “তুর্কোমান” (তুর্কমেন) দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়; এই প্রক্রিয়াটি ১৩ শতকের শুরুতে সম্পন্ন হয়েছিল।

তুর্কোমানরা ছিল সেইসব তুর্কি, বেশিরভাগই কিন্তু একচেটিয়াভাবে ওগুজ নয়, যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিল এবং তাদের পূর্বপুরুষদের চেয়েও বেশি আসীন জীবনযাপন করতে শুরু করেছিল।

১৪ শতকে, ওঘুজ-এর একটি ফেডারেশন, বা, এই সময়ের মধ্যে, তুরকোমান উপজাতি, যারা নিজেদেরকে আক-কয়ুনলু নামে অভিহিত করেছিল, তারা একটি রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেছিল যা পূর্ব তুরস্ক, আজারবাইজান, ইরাক এবং পশ্চিম ইরানে শাসন করেছিল।

এই বইয়ের লেখক কোরকুত আতা কে ছিলেন?


তিনি ছিলেন অঘুজ-তুর্ক সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রসিদ্ধ শাখা ‘কায়ী গোত্র’র সদস্য। তিনি মূলত প্রসিদ্ধ তার রচিত কিতাব ‘দেদে কোরকুত’ বা ‘The book of dede kurkot’ এর জন্য। যা অঘুজ তুর্কমানদের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ইতিহাসে পাতায় তিনি তেমন একটা পরিচিত নন। তবে ইতিহাসের পাতায় চোখ বোলালে কোরকুত আতা সম্পর্কে বেশ চমকপ্রদ কিছু তথ্য সামনে চলে আসে।

>তিনি প্রসিদ্ধ ছিলেন ‘ দেদে কোরকুত’র জন্য। অথচ অনেকের মতে তিনি ছিলেন নিরক্ষর।

>কোরকুত আতা নিরক্ষর হওয়ায় লিপিকারের সাহাজ্যে এই গ্রন্থ রচনা করেন।

>চতুর্দশ শতাব্দীর মিসরীয় ঐতিহাসিক ইবনে আইবেক আল-দাওয়ারী এবং পার্সিয়ান ঐতিহাসিক রশীদ-আল-দ্বীন ফাদলুল্লাহ আল হামদানীর মতে দাদা কোরকুত রাসূল সাঃএর যুগে জীবিত ছিলেন।

>রশীদ-আল-দ্বীন আল হামদানী(গাজালী) বর্ণনা করেন, নবম অঘুজ শাসক ইনল সির ইয়াভকু খান কোরকুত আতাকে রাসূল সাঃ এর নিকট দূত হিসেবে প্রেরণ করেন। সেখানে গিয়ে তিনি তাদের উত্তম চরিত্র দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ইসলাম গ্রহন করেন। এবং মুসলমান হয়ে অঘুজ রাজ্যে ফিরে আসেন। অতঃপর অঘুজ গ্রেট খানদের পরামর্শক হিসেবে নিযুক্ত হন।

>রশীদ-আল-দ্বীন আল-হামদানী তার ‘জামি আল-তাওয়ারিখ’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, কোরকুত আতা ২৯৫বছর জীবিত ছিলেন!

Leave a Comment